১ম গোলটেবিল বৈঠক : ‘গ্রামীণ বসতির নবরূপের সম্ভাবনা’

সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে পেশাজীবীদের মতামত জনসম্মুখে উপস্থাপনের লক্ষ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে ফোরাম ফর ফিজিক্যাল ডেভেলপমেন্ট অব বাংলাদেশ (এফপিডি)। এর বিভিন্ন কার্যক্রমের একটি হচ্ছে বিষয়ভিত্তিক আলোচনার মাধ্যমে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গের মতামত সংগ্রহ করে প্রকাশনা বের করা। এই উদ্দেশ্যে গত ২৪ জুন ২০০৯ তারিখে Renewal Prospect of Rural Habitat (গ্রামীণ বসতির নবরূপের সম্ভাবনা) শীর্ষক প্রথম গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় শেল্টেক্ লাউঞ্জে, ৫৫ পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা-১২০৫। উক্ত গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।

১)  ড. তৌফিক এম. সেরাজ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, শেল্টেক্ (প্রা:) লিমিটেড; চেয়ারম্যান, এফপিডি

২)  স্থপতি কাজী আনিসউদ্দিন ইকবাল, চেয়ারম্যান, বিল্ডিং ফর ফিউচার লিমিটেড; নির্বাহী পরিচালক, এফপিডি

৩) প্রকৌশলী তানভিরুল হক প্রবাল, সভাপতি, রিহ্যাব; ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বিল্ডিং ফর ফিউচার; ফিন্যান্স ডিরেক্টর, এফপিডি

৪) প্রকৌশলী রবিউল আলম, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, এনার্জিপ্যাক লিমিটেড; ডিরেক্টর, এফপিডি

৫) অধ্যাপক ড. সেলিম রশীদ, ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয়, যুক্তরাষ্ট্র

৬) অধ্যাপক ড. জেবা ইসলাম সেরাজ, প্রাণরসায়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

৭) অধ্যাপক ড. মো. রেজাউর রহমান, ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার অ্যান্ড ফ্লাড ম্যানেজমেন্ট, বুয়েট

৮) অধ্যাপক ড. শায়ের গফুর, স্থাপত্য বিভাগ, বুয়েট

৯) অধ্যাপক ড. আব্দুল জব্বার খান, পুরকৌশল বিভাগ, বুয়েট

১০) অধ্যাপক ড. খন্দকার সাব্বির আহমেদ, স্থাপত্য বিভাগ, বুয়েট

১১) অধ্যাপক ড. মিহির কুমার রায়, স্কুল অব বিজনেস, সিটি ইউনিভার্সিটি

১২) জনাব আদিল মোহাম্মদ খান, প্রভাষক, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

১৩) প্রকৌশলী আব্দুল মোমেন, প্রধান প্রকৌশলী, পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড

১৪) প্রকৌশলী নাইমা নাজরীন নাজ, ঊর্ধ্বতন সহকারী প্রকৌশলী, এলজিইডি

১৫) প্রকৌশলী মো. নিজাম উদ্দিন, এলজিইডি

১৬) পরিকল্পনাবিদ মো. নবীউল ইসলাম, এলজিইডি

১৭) পরিকল্পনাবিদ জিনাত নাহরীন, সহকারী প্রধান পরিকল্পনাবিদ, শেল্টেক্ (প্রা:) লিমিটেড

১৮) অ্যাডভোকেট লুতফে আলম, আইন উপদেষ্টা, শেল্টেক্ (প্রা:) লিমিটেড

১৯)  জনাব এ.কে.এম. আলমগীর কবির দেওয়ান, নগর পরিকল্পনাবিদ, শেল্টেক্ (প্রা:) লিমিটেড।

. তৌফিক এম. সেরাজ,  স্বাগত বক্তব্য উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, আমরা অনুধাবন করতে পেরেছি, বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গের জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতা দেশের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার জন্য একটি উপযুক্ত ফোরাম তৈরি করা প্রয়োজন। আমাদের প্রধান উদ্দেশ্য এমন একটি ক্ষেত্র তৈরি করা, যেখানে দেশের দক্ষ, অভিজ্ঞ এবং যোগ্যতাসম্পন্ন বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ তাদের অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান দেশের মানুষের সামনে তুলে ধরতে পারবেন।

তৌফিক এম. সেরাজ আরও বলেন, আমরা জানি, বাংলাদেশ অত্যন্ত ক্ষুদ্র একটি দেশ কিন্তু আয়তনের তুলনায় এর জনসংখ্যা অনেক বেশি। তা ছাড়া আমাদের দেশের অধিকাংশ লোক গ্রামে বসবাস করে। ক্রমবর্ধমান এই গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর বাসস্থান সরবরাহের জন্য দেশের পল্লী অঞ্চলে আবাসনব্যবস্থার আধুনিকায়ন প্রয়োজন। তা ছাড়া বর্ধিত জনসংখ্যার বাসস্থান জোগান দিতে প্রতিনিয়তই উর্বর কৃষিজমির পরিমাণ কমছে। কাজেই উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার করে স্বল্প পরিসরে অধিক বাসস্থান সরবরাহ করতে হবে। সেই লক্ষ্যে আমাদের আলোচনার মূল বিষয়বস্তু Renewal Prospect of Rural Habitat (গ্রামীণ বসতির নবরূপের সম্ভাবনা)। কাজেই এই আলোচনা সভায় সংশ্লিষ্ট বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন পেশাজীবীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। আশা করি, আপনাদের মূল্যবান মতামতের ভিত্তিতেই সমস্যার সমাধানের কৌশল বেরিয়ে আসবে।

অধ্যাপক . সেলিম রশীদ, সর্বপ্রথম বক্তব্য উপস্থাপন করেন। তাঁর মতে, বাংলাদেশে অপরিকল্পিত উপায়ে গ্রামীণ রাস্তাঘাট গড়ে ওঠায় এর ঘনত্ব এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি। যার ফলে এসব রাস্তাঘাট পাকা করতে গেলে প্রচুর পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়। তাই গ্রামীণ বসতিকে নতুন করে সাজাতে তিনি Compact Township (CT)  এর ধারণা দেন। তিনি বাংলাদেশের পল্লী অঞ্চলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গড়ে ওঠা বসতির পরিবর্তে প্রায় ১০০ একর আয়তনের Compact Township (CT) প্রস্তাব করেন। তিনি বলেন, এই ধারণা সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়িত হলে পুরো দেশে চার হাজার ৫০০টির মতো CT গড়ে উঠবে অর্থাৎ প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে CT গড়ে উঠবে, যাতে প্রায় নয় কোটি লোক থাকতে পারবে। প্রতিটি CT তে কমবেশি ২০ হাজার লোক প্রস্তাব করেন, যাদের আবাসন হবে পরিকল্পিতভাবে বিন্যস্ত অ্যাপার্টমেন্টে যেখানে বসতবাড়ি, হাসপাতাল, স্কুল, কলেজ, হাটবাজার, গ্রামীণ শিল্পকারখানা, স্থানীয় সরকারি ব্যবস্থা এবং সব ধরনের নাগরিক সুযোগ-সুবিধা থাকবে। CT গুলো নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত হবে এবং স্বনির্ভর হবে। যান্ত্রিক যানবাহন মুক্ত হবে যাতে পরিবেশবান্ধব বসতি গড়ে তোলা যায় এবং CT গুলোর আয়তন ছোট হওয়ায় অযান্ত্রিক যানবাহন হবে মানুষের চলাচলের অন্যতম মাধ্যম।

তিনি Compact Township এর প্রয়োজনীয়তার কারণ হিসেবে বলেন, গ্রামাঞ্চলে বসতবাড়ি নির্মাণের ফলে বাংলাদেশে প্রতিবছর ১-২% করে কৃষিজমি কমে যাচ্ছে। গ্রামাঞ্চল থেকে মানুষ শহরে চলে আসার ফলে দ্রুত নগরায়ণ ঘটছে। শহরে জীবনধারণ কঠিন হয়ে পড়ছে এবং শহরগুলো কম উৎপাদনশীল হয়ে পড়ছে। গ্রামাঞ্চলে কর্মসংস্থানের হার দিন দিন কমে যাচ্ছে।

তিনি Compact Township এর অর্থায়ন ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, প্রতিটি CT নির্মাণ করতে হলে ২১০-৪২০ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। প্রতিটি পরিবারকে ২০০ বর্গফুটের একটি অ্যাপার্টমেন্ট দেওয়া হবে। অ্যাপার্টমেন্টের দাম তারা পরিশোধ করবে প্রতি মাসে এক হাজার টাকা করে দিয়ে ৪০ বছরে বিনা সুদে। শহরের বস্তিবাসীরা মাসিক ভাড়া বাবদ এর চেয়ে বেশি খরচ করে।

তাঁর মতামত অনুযায়ী, Compact Township পল্লী উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে। কারণ CT গুলো বেশ কিছু সুবিধা প্রদান করতে পারে, যেমন: বাংলাদেশে জনসংখ্যা যে হারে বাড়ছে, তাতে পল্লী বসতিগুলো এখনকার মতো বিচ্ছিন্নভাবে গড়ে উঠলে মারাত্মক কৃষিজমির সংকট দেখা দেবে। কিন্তু Compact Township এর মতো করে যদি ঘনবসতিপূর্ণ বসতি সৃষ্টি করা যায়, তাহলে কৃষিজমির ওপর আগ্রাসন শুধু কমবেই না, বরং নতুন করে আরও কিছু কৃষিজমি মুক্ত হবে। এ ছাড়া CT গুলোতে নগর সুবিধাদি বিদ্যমান থাকবে। ফলে পল্লী এলাকাতেই লোকজন নগর সুবিধা পেয়ে যাবে। সুতরাং পল্লী-নগর স্থানান্তর হ্রাস পাবে এবং এর ফলে আঞ্চলিক বৈষম্যও কমে যাবে। অবকাঠামোগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা হবে এ জন্য যে CT -এর বসতিগুলো ঘন সন্নিবেশিত হওয়ার কারণে অনেক ছোট জায়গাতেই নাগরিক সুযোগ-সুবিধাদি যেমন রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ, স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল প্রভৃতি প্রদান করা হবে। এখানে উল্লেখ্য, CT গুলো তৈরি করা হবে গুরুত্বপূর্ণ গ্রাম্যবাজার অথবা যেখানে ইতোমধ্যেই অবকাঠামো বেশ উন্নত অবস্থায় আছে এবং যার সঙ্গে সড়ক/রেল যোগাযোগ যথেষ্ট ভালো। আবার CT গুলোর আকার যথেষ্ট ছোট হওয়ার কারণে এগুলো Flood Level এর ওপরে তৈরি করা হবে। এতে একদিকে যেমন বন্যায় বাড়িঘর ধ্বংস হওয়ার ঝুঁকি এড়ানো যাবে, অন্যদিকে কৃত্রিমভাবে বাঁধ তৈরির খরচও বেঁচে যাবে। আবার প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রও রক্ষা পাবে।

CT গুলোয় যেকোনো শহরের মতোই Economics of Scale বিদ্যমান থাকবে এবং এর ফলে ছোট ছোট অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, এমনকি ক্ষুদ্র শিল্পকারখানাও আপনা-আপনি গড়ে উঠবে। শহর পরিচালনার জন্য স্থানীয় সরকার যথেষ্ট স্বাবলম্বী হতে পারবে। কারণ, শহর থেকে কর আদায় করা সহজতর হবে। দেশের সর্বত্র CT গড়ে উঠলে এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ অনেক সহজতর হবে। বিভিন্ন এলাকার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য বজায় রেখে CT গড়ে তুলতে হবে। গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিজ/ফ্যাক্টরিগুলোকে ঢাকার বাইরে নিয়ে এদের কেন্দ্র করে Compact Township গড়ে তোলা সম্ভব।

প্রকৌশলী মো. আব্দুল মোমেন,  তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন, গোলটেবিল বৈঠকের বিষয়টি অত্যন্ত সময়োপযোগী। কারণ, বাংলাদেশে ভূমির তুলনায় জনসংখ্যা অনেক বেশি। গ্রামীণ পটভূমিতে জমির অপচয় রোধ করে পরিকল্পিত উপায়ে একত্রীকরণের মাধ্যমে উন্নত জীবনযাপনের সুবিধা সৃষ্টি করে দিলে, গ্রামীণ বসতির নবরূপ দেওয়া সম্ভব হবে। তবে কোনো ক্রমেই গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর গতানুগতিক জীবনযাত্রা এবং খোলামেলা পরিবেশ নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না। সে ক্ষেত্রে স্বল্প খরচে সীমিত পরিসরে মাটির নিচে একতলাসহ নিচতলা এবং দ্বিতীয় তলা নির্মাণ করে অধিক বাসস্থানের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। ভবনের চারপাশে গাছপালা, সবজি-বাগান, গোয়ালঘর, ছোট পুকুর সবকিছুই রাখতে হবে। এই ধরনের বসতিতে ন্যূনতম আধুনিক সুবিধাদি তথা বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস, নিরাপত্তা এবং বিনোদনব্যবস্থা রাখা জরুরি।

জনাব আদিল মুহাম্মদ খান, প্রভাষক, তার বক্তব্যে কিছু সুপরিশ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ভূমি সংস্কারের মাধ্যমে ভূমি পুনর্বণ্টন, বিশেষ করে প্রান্তিক ও ভূমিহীন চাষিদের ন্যূনতম ভূমির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। বসতির পাশাপাশি পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন, যা গ্রাম থেকে শহরে অভিগমন রোধে সহায়ক হবে। গুচ্ছগ্রাম, আশ্রয়ণ প্রকল্প প্রভৃতির সাফল্য ও ব্যর্থতা খতিয়ে দেখতে হবে। তিনি আরও বলেন, সারা দেশের খাসজমির বণ্টনে বাস্তবসম্মত নীতিমালা প্রয়োজন। নদীভাঙনের ফলে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ার বিপরীতে যারা বাস্তুহারা হচ্ছে, তাদেরকে চরের জমি বণ্টনের ব্যাপারে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। ব্যক্তিমালিকানায় জমির ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণের মাধ্যমে জমির সুষ্ঠু প্রয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ত ছাড়া Renewal -এর ক্ষেত্রে আইনি বিষয় ও সামাজিক প্রভাব বিবেচনায় নিতে হবে।

পরিকল্পনাবিদ জীনাত নাহরীন,  বলেন; অপরিকল্পিত ও দ্রুত নগরায়ণকে নিরুৎসাহিত করতে গ্রামীণ বসতির নবরূপের প্রয়োজন। এ কারণে গ্রামকে অধিক বসবাসের উপযোগী করে তুলতে হবে। বিভিন্ন প্রকল্পের অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি সিলেট অঞ্চলের উদাহরণ দেন। তিনি বলেন, বিদেশ থেকে প্রেরিত অর্থের আধিক্যকে সঠিকভাবে কাজে লাগানোর উদ্দেশ্যে সরকারিভাবে নীতিমালা প্রণয়ন করা প্রয়োজন। অনুৎপাদনশীল ব্যবহার রোধ করে উৎপাদনশীল খাতে এই অর্থ ব্যবহার করতে হবে। আঞ্চলিক উৎপাদনভিত্তিক দ্রব্যাদি ও কৃষিভিত্তিক শিল্পকারখানা প্রতিষ্ঠার বিষয়ে উৎসাহিত করতে হবে। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে গ্রামমুখী হওয়ায় উৎসাহিত করলে তবেই গ্রামীণ বসতির নবরূপের সম্ভাবনা প্রকৃত অর্থে অর্থপূর্ণ হবে।

.কে.এম. আলমগীর কবির দেওয়ান, তাঁর বক্তব্যে বলেছেন; Compact Township প্রয়োজন কিন্তু গ্রামীণ জীবনযাত্রাকে বিবেচনায় রাখতে হবে। একত্রিত বাসস্থানে অবকাঠামো এবং আনুষঙ্গিক সুবিধাদি প্রদান করা সহজ হবে। তিনি পরীক্ষামূলক প্রকল্প শুরু করার কথা বলেন, যেখানে অনেক খাসজমি পাওয়া যায় এবং যেখানে গ্রামীণ বসতির জন্য জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়। উদাহরণস্বরূপ ধরা যায়, হাতিয়া বা সুবর্ণচর এলাকাকে। কর্মসংস্থান এবং নাগরিক সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে গ্রাম থেকে শহরে অভিবাসন কমাতে হবে। এফপিডির পক্ষ থেকে ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যানের পরামর্শকদের এই বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

অধ্যাপক . মিহির কুমার রায়, বলেছেন; বিভিন্ন দেশের উদাহরণ থেকে যাচাই-বাছাই করে গ্রামীণ বসতির পুনর্বন্দোবস্তের ব্যবস্থা করলে, (১) গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সাধারণ জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আসবে, (২) ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তা অনুসরণ করবে, (৩) সামাজিক সৌহার্দ্য পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে, (৪) জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সম্ভব হবে, (৫) গতানুগতিক গ্রামীণ জীবনযাত্রার পরিবর্তন হয়ে আধুনিক জীবনযাপন সম্ভব হবে। তিনি প্রস্তাব করেন, এই সম্ভাবনাগুলো বাস্তবায়নের প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে দু-একটি প্রকল্প হাতে নিয়ে এর সুবিধা-অসুবিধাগুলো যাচাই-বাছাই করা যেতে পারে। এ ধরনের কাজ বাস্তবায়নের প্রধান দায়িত্ব কে নেবে এবং গ্রামের অধিবাসীদের সচেতন করা হবে কীভাবে এ বিষয়গুলো বড় অন্তরায় হতে পারে। এ ধরনের উদ্যোগে সমবায়ের মাধ্যমে কৃষিকাজ, মৎস্য চাষ, গবাদি পশু ও হাঁস-মুরগি পালন করে গ্রামের অধিবাসীদের আয় বাড়ানো যেতে পারে। তিনি শিক্ষার ওপর জোর দিয়ে বলেন, গ্রামীণ কৃষিভিত্তিক সমাজ থেকে আধুনিক গ্রামে রূপান্তর করতে হলে প্রথমে শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে। বিদেশ থেকে প্রেরিত অর্থের পরিমাণ বাড়ানো সম্ভব এই ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে। কারণ, প্রবাসী বাংলাদেশিরা উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী কিন্তু উপযুক্ত সুযোগ পায় না।

অধ্যাপক . সাব্বির আহমেদ, বলেছেন; গ্রামকে একত্রীকরণ বা গ্রামীণ বসতিকে একত্রীকরণ মানে শহর তৈরি করা নয়। বাহ্যিক পরিবেশ, সমাজকাঠামো এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভিত্তিতে গ্রামগুলোকে স্বনির্ভর করতে হবে। সুবিধাজনক পর্যায়ে গ্রামীণ পরিবেশকে টিকিয়ে রাখতে হবে। যথাযথ প্রযুক্তির ব্যবহারে off-the-grid settlement এর ধারণা ব্যবহার করা যেতে পারে। Compact Township -এর ধারণা তাপমাত্রার প্রতিকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে। প্রয়োজনে আমরা প্রযুক্তি ও কৌশল অবলম্বন করে অধিক ঘনবসতিপূর্ণ উন্নত ব্যবস্থার কথা ভাবতে পারি।

অধ্যাপক . মো. রেজাউর রহমান, উল্লেখ করেছেন, Compact Township এ বন্যানিয়ন্ত্রণব্যবস্থা থাকতে হবে। এতে ভূমি ক্ষয় রোধ হবে। পরীক্ষামূলক প্রকল্পের মাধ্যমে Compact Township এর ধারণাকে জনপ্রিয় করা যেতে পারে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পদ্মা সেতু নির্মাণের সময় তীরবর্তী এলাকায় ঐচ্ছিক পুনর্বাসনের মাধ্যমে শহর তৈরি করা যেতে পারে।

অধ্যাপক . আব্দুল জব্বার খান,  বলেছেন; উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ এলাকায় রাস্তার ঢাল ১:২ এর বদলে ১:১ করা যেতে পারে। এতে প্রতি ১০০০ কিলোমিটার রাস্তায় ৫০০ একর জমি বাঁচানো সম্ভব, যা দিয়ে Compact Township এ এক লাখা বাসস্থান প্রদান করা সম্ভব। এবড় Geo- textile Reinforcement (Synthetic as Jute) ব্যবহার করে এটা করা সম্ভব। আইলার আঘাতে প্রায় ১৪০০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নষ্ট হয়েছে। এ ধরনের মারাত্মক ক্ষতি দূর করা যাবে। ভূমির সঠিক ব্যবহার এবং ভূমির ক্ষয় রোধ করা যাবে। Jute Geo-textile Reinforcement ব্যবহার করে গ্রামের রাস্তা নির্মাণ খরচ কমানো সম্ভব। সেই সঙ্গে, কৃষিনির্ভর গ্রামবাসীদের আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তন করা সম্ভব।

অধ্যাপক . শায়ের গফুর, বলেছেন ‘গ্রামীণ বসতির নবরূপের সম্ভাবনা’ যথাযথ শিরোনাম। এই সম্ভাবনার যথাযথ পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের জন্য কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় আনা যায়; যেমন আবাসন System of activities in system of settings -এর যথাযথ রূপান্তর নিশ্চিত করতে হবে। এতে প্রচলিত জীবনধারা প্রবলভাবে ব্যাহত হবে না। গ্রামীণ বসতির নব সম্ভাবনায় যাতে বর্তমান গ্রামীণ সমাজকাঠামোর অবনতি না হয়, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। ক্ষুদ্র চাষির ভূমিহীন হওয়া রোধ করতে হবে। বর্তমান বেড়িবাঁধের ওপর এবং দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর একসঙ্গে থাকার অভিজ্ঞতা বিবেচনায় রাখতে হবে।

তিনি আরও বলেন, কোনো একটি নির্দিষ্ট Compact Township মডেল না হয়ে স্থান-কালভেদে বৈচিত্র্য আসতে পারে। ভবিষ্যৎ বসতির পরিকল্পনায় বর্তমানের Service Network কীভাবে সম্পর্কিত হবে, তা GIS -এর মাধ্যমে বিবেচনায় আনা যেতে পারে। ঘনবসতির পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে Participatory Rural Appraisal (PRA) প্রয়োগ করে এর বাস্তবায়নে Facilitator -এর ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে। এতে প্রকল্প বাস্তবায়নের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে।

অ্যাডভোকেট লুতফে আলম,  উল্লেখ করেছেন; গ্রামীণ উন্নয়ন সমাজতান্ত্রিক দেশসমূহ ফলপ্রসূ করতে পেরেছে কিন্তু গণতান্ত্রিক দেশসমূহ পারেনি। গ্রামীণ উন্নয়ন বলতে আমাদের দেশে তেমন কোনো কিছুই হয়নি শুধু কিছু টিউবওয়েল বসানো ছাড়া।

তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশে খাসজমির পরিমাণ খুব বেশি নেই। শুধু বন ও নদীর চর বাদ দিলে তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য পরিমাণ খাসজমি নেই। নতুন করে গ্রামীণ পুনর্বাসন করতে গেলে জমি অধিগ্রহণ নিয়ে সমস্যা দেখা দেবে। গ্রামের লোকজন সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিরোধ করতে পারে। কারণ, তারা বাপ-দাদার ভিটা সহজে ছাড়তে চাইবে না।

গ্রামের লোকজনকে প্রভাবিত করার ব্যাপারে NGO গুলো উল্লেখযোগ্য ভূমিকার কথা তিনি তুলে ধরেন। যেমন: গ্রামীণ ব্যাংক। ২০০ পরিবারের জন্য ছোট পরিসরে শহরতলি গড়ে তোলা যেতে পারে। আমাদের দেশে জমি পুনর্বিন্যাসের কোনো আইন নেই। শুধু রাষ্ট্রপতি এরশাদের শাসন আমলে একটি আইন হয়েছিল, গ্রামের জমি বেনামে কেউ কিনতে পারবে না। নতুন করে গ্রামীণ বসতি তৈরি করতে হলে প্রথমে জমি পুনর্বিন্যাসসংক্রান্ত একটি কার্যকরী আইন প্রণয়ন করতে হবে।

প্রকৌশলী মো. নিজাম উদ্দিন,  বলেছেন; গ্রামীণ সমাজব্যবস্থা, পরিবেশ, কৃষিকাজ, মৎস্য চাষ ইত্যাদিকে গুরুত্ব দিয়ে ২০ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন করা প্রয়োজন। উন্নত পরিকল্পনা এবং এর সঠিক বাস্তবায়নসহ সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। গ্রামীণ অধিবাসীদের অভ্যাস পরিবর্তনের জন্য উৎসাহী করতে হবে, প্রয়োজনে উচ্চপর্যায়ের নির্দেশ প্রদান করতে হবে। আয়ের উৎস মজবুত করতে হবে। কর্মক্ষেত্র বৃদ্ধি করতে হবে। উন্নত গ্রামীণ নকশা পেতে হলে এলজিইডির ম্যাপ, উপজেলা মাস্টার প্ল্যান, GIS এবং Remote Sensing ব্যবহার করা যেতে পারে। উন্নত অবকাঠামো এবং সামাজিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যান্য উন্নয়নমূলক কাজের অভিজ্ঞতা এবং অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় সাধন করতে হবে।

প্রকৌশলী রবিউল আলম,  বলেন; গ্রামের প্রতিটি বাড়ির সঙ্গেই আয়ের উৎস থাকতে হবে। আমাদের দেশে পল্লী এলাকার জন্য সৌরশক্তি ব্যবহার করাই সবচেয়ে বেশি উপযুক্ত। কিন্তু বর্তমানে যে সৌরশক্তির ব্যবহার হচ্ছে, তার কার্যক্ষমতা ১৯-২০%। এই সৌরশক্তি সঠিক পদ্ধতিতে ব্যবহার করলে কার্যক্ষমতা ৭০% পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব হবে। গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে সৌরশক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে এনজিওর সহযোগিতা নেওয়া যেতে পারে।

প্রকৌশলী নাইমা নাজরীন নাজ,  বলেছেন; গ্রামের সেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঠিক পরিচালনা নিশ্চিত করতে হবে। উন্নয়নমূলক কাজে অধিবাসীদের সবার অংশগ্রহণ থাকতে হবে। গ্রামীণ অবকাঠামোর সঠিক পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। বাসস্থান পুনর্বিন্যাসে GIS ব্যবহার করা যেতে পারে।

পরিকল্পনাবিদ মো. নবীউল ইসলাম, বলেছেন; গ্রাম থেকে শহরে স্থানান্তর হয় মূলত Push- Pull factor-এর মাধ্যমে। Rural Center (হাটবাজার) কে কেন্দ্র করে উন্নয়ন করতে হবে। Roadside Settlement করা যেতে পারে। গার্মেন্টস শিল্পগুলোকে Decentralize করে রংপুর বা কুড়িগ্রামে নিয়ে যেতে হবে, যেখানে মঙ্গাপীড়িত লোকজন বসবাস করে।

প্রকৌশলী তানভিরুল হক প্রবাল,  বলেন; পর্যাপ্ত পরিমাণ নাগরিক সুযোগ-সুবিধা যেমন: গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ ইত্যাদি না থাকার কারণে আমরা প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে অ্যাপার্টমেন্ট তৈরি করতে পারছি না। সরকার জুন, ২০০৮ এ একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, গ্রামে ২৬০০০ অ্যাপার্টমেন্ট বানানোর জন্য কিন্তু যথাপযুক্ত দিকনির্দেশনা পাওয়া যায়নি। প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ফলে মোবাইল ফোনের বিস্তার হয়েছে। এখন গ্রামে মোবাইল ফোন সবার হাতে হাতে পৌঁছে গেছে, তাই এখন অনেক কিছুই করা সম্ভব। এই মোবাইল কোম্পানিগুলোর টাওয়ার গ্রামে-গঞ্জে অনেক জমি নষ্ট করছে। এ ব্যাপারে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে কীভাবে জমির এই অপচয় রোধ করা যায়।

অধ্যাপক . জেবা ইসলাম সেরাজ, বলেছেন; গ্রামে ছড়ানো-ছিটানো বাসস্থানের পরিবর্তে বহুতলবিশিষ্ট ভবন প্রয়োজন। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বায়োগ্যাস উৎপাদন করতে হবে। পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করতে হবে প্রতিটি পরিবারের (১) তরল বর্জ্য (মূত্র) সংগ্রহ করা যেতে পারে ইউরিয়ার উৎস হিসেবে (২) কঠিন বর্জ্য (মল) আলাদাভাবে মাটির সংমিশ্রণে সংগ্রহ করে সার হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। হাঁস-মুরগির বর্জ্য থেকে বায়োগ্যাস উৎপাদন করে জেনারেটর চালানো সম্ভব। Floating Reeds -এর ওপর যেখানে সারা বছর পানির অভাব হবে না, সেখানে শাকসবাজি উৎপাদন করা যেতে পারে।

Leave a Reply