২ য় গোলটেবিল বৈঠক : ‘গ্রামীণ বসতির নবরূপের সম্ভাবনা’

সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে পেশাজীবীদের মতামত জনসম্মুখে উপস্থাপনের লক্ষ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে ফোরাম ফর ফিজিক্যাল ডেভেলপমেন্ট অব বাংলাদেশ (এফপিডি)। এর বিভিন্ন কার্যক্রমের একটি হচ্ছে বিষয়ভিত্তিক আলোচনার মাধ্যমে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গের মতামত সংগ্রহ করে প্রকাশনা বের করা। এই উদ্দেশ্যে গত ২৯ জুন ২০০৯ তারিখে  Renewal Prospect of Rural Habitat (গ্রামীণ বসতির নবরূপের সম্ভাবনা) শীর্ষক দ্বিতীয় গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় র‍্যাফলেশিয়া, বাড়ি নং-২, রোড নং-২২, গুলশান-১, ঢাকা। উক্ত গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন-

১) ড. তৌফিক এম. সেরাজ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, শেল্টেক্ (প্রা.) লিমিটেড; চেয়ারম্যান, এফ.পি .ডি

২)  স্থপতি কাজী আনিসউদ্দিন ইকবাল, চেয়ারম্যান, বিল্ডিং ফর ফিউচার লিমিটেড; নির্বাহী পরিচালক, এফ.পি.ডি

৩) প্রকৌশলী তানভিরুল হক প্রবাল, সভাপতি, রিহ্যাব; ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বিল্ডিং ফর ফিউচার লিমিটেড; ফিন্যান্স ডিরেক্টর, এফ.পি.ডি

৪) প্রকৌশলী মাহমুদুল হাসান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, হাসান অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেড; সদস্যসচিব, এফ.পি.ডি

৫) অধ্যাপক ড. এ. আই. মাহবুব উদ্দিন আহমেদ, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

৬) অধ্যাপক ড. এ.এস.এম. আমানুল্লাহ, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

৭) অধ্যাপক ড. এস. আই. খান, অধ্যাপক, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি

৮) প্রকৌশলী মাইনুদ্দিন আহমেদ, পরিচালক, এইচ.বি.আর.আই

৯) ড. মোহাম্মদ শরিফুল ইসলাম, সহযোগী অধ্যাপক, পুরকৌশল বিভাগ, বুয়েট

১০) পরিকল্পনাবিদ রুখসানা পারভীন, ডেপুটি টিম লিডার, পৌরসভা মাস্টার প্ল্যান প্রণয়ন প্রকল্প, শেল্টেক্ (প্রা.) লিমিটেড

১১) জনাব মো. ফজলুল কাদের, মহাব্যবস্থাপক, পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন

১২) পরিকল্পনাবিদ ড. কে. জেড. হোসেন তৌফিক, সিনিয়র প্ল্যানার, নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর

১৩) পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম, সহকারী পরিচালক, রাজউক

১৪) পরিকল্পনাবিদ মো. আমিনুল কাইয়ুম, সহকারী পরিচালক, নগর পরিকল্পনা বিভাগ, রাজউক

১৫) পরিকল্পনাবিদ এ. এইস. এম. মোজাম্মেল, এনভায়রনমেন্টাল প্ল্যানার, ই.পি.সি

. তৌফিক এম. সেরাজ,  স্বাগত বক্তব্য উপস্থাপন করেন। আমাদের এই ফোরামের প্রধান উদ্দেশ্য এমন একটি মাধ্যম তৈরি করা, যেখানে দেশের দক্ষ, অভিজ্ঞ এবং যোগ্যতাসম্পন্ন বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ তাদের অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান দেশের মানুষের সামনে তুলে ধরতে পারবেন। এ পর্যায়ে আমরা বিষয়ভিত্তিক গোলটেবিল বৈঠক করে বিশেষজ্ঞ মতামত সংগ্রহ করে একটি প্রকাশনা বের করব এবং সমস্যা সমাধানের সম্ভাব্য কৌশল বের করে তা কার্যকর করার জন্য নীতিনির্ধারকদের উৎসাহিত করব।

আমাদের দেশের পেশাজীবী সংগঠনগুলো তাদের নির্দিষ্ট পেশায় নিয়োজিতদের স্বার্থ সংরক্ষণ নিয়েই প্রধানত কাজ করে। কিন্তু আমরা চাচ্ছি, এই ফোরামের মাধ্যমে সব পেশার সমন্বয় সাধন সম্ভব হবে। আমরা দেশের অবকাঠামো উন্নয়নের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করব। আমরা যদি এ রকম গোলটেবিল আলোচনার মাধ্যমে গ্রামীণ বসতির নবরূপ দেওয়ার সঠিক কোনো কৌশল উদ্ভাবন করে সরকারের কাছে উপস্থাপন করতে পারি, তাহলে ভবিষ্যতে এই ধরনের উদ্যোগ নেওয়া সরকারের জন্য সহজ হবে। আমরা মনে করি, আগামী দিনগুলোতে গ্রামীণ বসতির বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাবে। কারণ, সারা দেশের আবাসন সমস্যা সমাধান না করে ঢাকার সমস্যা সমাধান সম্ভব না।

 বাংলাদেশ অত্যন্ত ক্ষুদ্র একটি দেশ কিন্তু আয়তনের তুলনায় এর জনসংখ্যা অনেক বেশি। তা ছাড়া আমাদের দেশের অধিকাংশ লোক গ্রামে বসবাস করে। ক্রমবর্ধমান এই গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর বাসস্থান সরবরাহের জন্য দেশের পল্লী অঞ্চলে আবাসনব্যবস্থার আধুনিকায়ন প্রয়োজন। তা ছাড়া বর্ধিত জনসংখ্যার বাসস্থান জোগান দিতে প্রতিনিয়তই উর্বর কৃষিজমির পরিমাণ হ্রাস পাচ্ছে। কাজেই উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার করে স্বল্প পরিসরে অধিক বাসস্থান সরবরাহ করতে হবে। সেই লক্ষ্যে আমাদের আলোচনার মূল বিষয়বস্তু Renewal Prospect of Rural Habitat (গ্রামীণ বসতির নবরূপের সম্ভাবনা)। কাজেই এই আলোচনা সভায় সংশ্লিষ্ট বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন পেশাজীবীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। আশা করি আপনাদের মূল্যবান মতামতের ভিত্তিতেই সমস্যা সমাধানের কৌশল বেরিয়ে আসবে।

অধ্যাপক . এস. আই. খান, অতিথিদের মধ্যে সর্বপ্রথম বক্তব্য উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন; বাংলাদেশে বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি। জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় এক হাজার ২০০ জন। জনসংখ্যা গত ৬০ বছরে চার গুণ বেড়েছে। মাথাপিছু জমির পরিমাষ- আমেরিকায় ৮০০ শতাংশ, চীনে ২৩০ শতাংশ, ভারতে ৮০ শতাংশ, জাপানে ৮০ শতাংশ, বাংলাদেশে ২৪ শতাংশ। প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনসংখ্যার ঘনত্ব আমেরিকায় ৩০ জন, চীনে ১৪০ জন, ভারতে ৩৪০ জন, জাপানে ৩৩০ জন, বাংলাদেশে ১২০০ জন। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনসংখ্যার ঘনত্ব ৯০০ জন। জনসংখ্যা বাড়ছে প্রতিনিয়ত কিন্তু কৃষি জমির পরিমাণ কমছে। তার মানে আমাদের এখন কম জমিতে অধিক খাদ্য উৎপাদন করতে হবে। কৃষিজমিতে কোনো প্রকার সরকারি বা বেসরকারি স্থাপনা তৈরি আইন করে বন্ধ করে দিতে হবে। Growth Center গুলোকে প্রাধান্য দিতে হবে। ভূমিহীন কৃষককে উপজেলা কেন্দ্রের ভেতর রাখতে হবে। প্রতিটি উপজেলাতে Land use Planning দরকার। গার্মেন্টস শিল্পকে Decentralization করা দরকার। উদাহরণস্বরূপ; জাপানে টয়োটা গাড়ির শুধু ইঞ্জিন তৈরি হয় শহরে আর বাকি সব যন্ত্রাংশ তৈরি হয় ভিন্ন ভিন্ন গ্রামে। Participatory Rapid Rural Appraisal করা যেতে পারে। Remittance দিয়ে গ্রামীণ উন্নয়ন ব্যাংক গঠন করা যেতে পারে। গ্রামে থাকতে হলে প্রতিটি বাড়ির আয়ের উৎস থাকতে হবে। উদাহরণস্বরূপ শ্রীলঙ্কাতে প্রতিটি বাড়ির আলাদা আয়ের উৎস আছে। নিরাপত্তাসহ নাগরিক সুযোগ-সুবিধা পর্যাপ্ত পরিমাণে থাকতে হবে।

প্রকৌশলী মাইনুদ্দিন আহমেদ, বলেন; আদর্শ গ্রাম নিয়ে কাজ করার সময় লক্ষ করেছি, গ্রামবাসীর আয়ের উৎস পর্যাপ্ত নয়। বছর তিনেক পরে দেখা যায়, তারা গৃহের উন্নত নির্মাণসমগ্রী বিক্রি করে দিয়েছে। গ্রামীণ অঞ্চলে ১৮-৩০% অধিবাসী উন্নত নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করে, অন্যরা স্থানীয় উপকরণ ব্যবহার করে। যেমন গোলপাতার ঘর। প্রতিবছর প্রায় ২% কৃষিজমি নষ্ট হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ৪০ পর পরে কোনো কৃষিজমি থাকবে না। বন্যাপ্রবণ এলাকায় ভাসমান বাড়ি তৈরি করা যেতে পারে। রমনা লেকের ওপর জরুরি সময়ে ব্যবহারের জন্য ৬০৭ বর্গফুটের একটি ভাসমান বাড়ি তৈরি করা হয়েছে। এটাতে ১০০০ জন একসঙ্গে উঠতে পারবে। এলাকাভিত্তিক পুনর্বাসনের জন্য বসতির ধরন নির্ণয় করতে হবে। ইট, সিমেন্ট ইত্যাদির ব্যবহার সীমিত করে স্থানীয়ভাবে প্রাপ্য নির্মাণসামগ্রীর ব্যাপক ব্যবহার করা প্রয়োজন। প্রচলিত প্রযুক্তির উন্নয়ন করে এর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। Growth Area বসতি পত্তন করে যাতায়াতসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা কাজে লাগাতে হবে। অকৃষিজ পতিত জমিতে পুনর্বাসনের কার্যক্রম গ্রহণ করা যেতে পারে।

পরিকল্পনাবিদ কে. জেড. হোসেন তৌফিক, উল্লেখ করেন; শুধু মাটি নয়, পানিরও সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। গ্রাম, পলিমাটি, বন্যা নিয়ে বর্তমান এই ব্যবস্থা টেকসই হয়ে গেছে। প্রাকৃতিক পরিবেশকে কৃত্রিম কিছু দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া ঠিক হবে না। যেমন বন্যাপ্রবাহ বাঁধ দিয়ে বন্ধ করে দেওয়ার কারণে যশোরে বিল ডাকাতিয়া ও ভবদাহতে মানুষের দুর্বিষহ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। আভিজাত্য কমিয়ে আনলে টেকসই গ্রাম তৈরি করা সম্ভব। জনশক্তি রপ্তানি করতে হবে। দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা আবশ্যক এবং এ বিষয়ে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজন। দাতা গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রকম উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে। যেমন ১৯৮০ সালে উপজেলা মাষ্টার প্ল্যান হয়েছিল ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের অর্থায়নে। মোগল ও ব্রিটিশরাও উন্নয়ন করেছিল তাদের সুবিধার জন্য। বাহ্যিক অবকাঠামোর চেয়ে সামাজিক অবকাঠামোর উন্নয়ন বেশি জরুরি। গ্রাম উন্নয়ন করার ক্ষেত্রে ওই এলাকার স্থায়ী আদিবাসীদের মতামতের প্রাধান্য দিতে হবে।

অধ্যাপক . মো. শরিফুল ইসলাম,  বলেন; বাংলাদেশে ৮২% বাড়িঘর হচ্ছে কাঁচা। স্থানীয় উপকরণ ব্যবহার করে কারিগরি উপায়ে গ্রামীণ বাড়িঘর তৈরি করতে হবে। এর জন্য গবেষণা করে স্থানীয় উপকরণের উপযোগিতা তুলে ধরতে হবে। বিভিন্ন এলাকার জন্য বিভিন্ন ধরনের বাড়িঘরের বিন্যাস হতে পারে। কাঁচা বাড়ির ক্ষেত্রে পাট ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে বাড়ি আরও মজবুত হবে। সব ধরনের ঘরবাড়ির জন্য বাংলায় Manual তৈরি করতে হবে। সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য সমাধান দিতে হবে। প্রচলিত মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন।

অধ্যাপক আই মাহবুব আহমেদ, বলেছেন; Globalization এর prospective থেকে বলা যায়, এখন ধনী-গরিবের বৈষম্য বাড়ছে। বিনিয়োগ সব শহরে কেন্দ্রীভূত, তাই গ্রামে প্রকৃতপক্ষে উন্নয়ন অসম্ভব হয়ে পড়ছে। গ্রামীণ বসতির পুনর্বিন্যাস একটি স্বপ্ন। কোনো কর্তৃপক্ষ কীভাবে এই উন্নয়ন করবে তার একটি সঠিক দিকনির্দেশনা দরকার। এটা আসলে অত্যন্ত কঠিন কাজ আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে। এ ক্ষেত্রে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। Remittance আসার পর তা একটি Sign value তৈরি করে, যার ফলে বাড়ি পাকা করে, জীবনযাত্রার মানের পরিবর্তন ঘটে। পশ্চিমা বিশ্ব শিল্প কারখানাগুলোকে অনুন্নত বিশ্বের দিকে দিয়ে দিচ্ছে, ফলে নগরায়ণের সৃষ্টি হচ্ছে। এবং তখন থেকেই আমাদের তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে নগরায়ণের সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে।

অধ্যাপক . .এস.এম. আমানুল্লাহ, বলেন; সবকিছুই পরিবর্তন হয়, আমাদের ভারত উপমহাদেশের গ্রামের অবস্থার তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয় না। বর্তমানে বাংলাদেশের গ্রাম এলাকায় প্রায় তিন কোটি পরিবার বসবাস করছে। প্রতিবছর আরও প্রায় ৩০ লাখ জনসংখ্যা বাড়ছে। প্রতিবছর কমপক্ষে ১০ লাখ নতুন বাসস্থানের প্রয়োজন। বাংলাদেশে ৫০০টির মতো Growth Center রয়েছে। Globalization এর ফলে পরিবারের আকারে পরিবর্তন হচ্ছে। যেমন আগে যৌথ পরিবার দেখা যেত বেশি কিন্তু এখন একক পরিবার বেশি দেখা যায়। সামাজিক বন্ধন কমে যাচ্ছে বা ভেঙে যাচ্ছে। সাংস্কৃতিক পরিবর্তন ঘটছে। শিক্ষার হারও আগের থেকে বাড়ছে। বাংলাদেশে এ পর্যন্ত যত আদর্শ গ্রাম হয়েছে, তার একটিও এখন আর আদর্শ নেই। মানুষ এখন মাটির ঘরে লজ্জায় থাকতে চায় না। তাই গ্রাম উন্নয়নের জন্য National Policy দরকার। Public Private Partnership -এর মাধ্যমে Policy বাস্তবায়ন করা যেতে পারে এবং জনগণের প্রচন্ড ইচ্ছা থাকতে হবে।

পরিকল্পনাবিদ রুখসানা পারভীন, বলেছেন; আইন করে প্রয়োজনীয় কৃষিজমিতে অন্যান্য ধরনের ব্যবহার নিষিদ্ধ করতে হবে। গ্রামীণ বসতির নবরূপায়ণে যত দূর সম্ভব প্রাকৃতিক পরিবেশ বজায় রাখতে হবে। সেই সঙ্গে আধুনিক অত্যাবশ্যকীয় সুবিধাসহ গ্রাম্যবসতির আদি রূপের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে গ্রাম্যবসতির নবরূপায়ণ পরিকল্পনা করা যায়। উপরোক্ত শর্ত বজায় রাখতে পরিবার প্রতি বসতবাড়ির জমির পরিমাণ সীমিত করতে হবে। সমুদ্র উপকূলে অত্যন্ত বিপজ্জনক এলাকা চিহ্নিত করে তার বাইরে বসতি পরিকল্পনা করতে হবে। বিপদমুক্ত এলাকা নিশ্চিত করার পরেও ঘরবাড়ি নির্মাণের ক্ষেত্রে এমন সব উপকরণ উদ্ভাবন করতে হবে, যা এতদঞ্চলে বসবাসকারী জনগণের এবং গবাদিপশুর জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।

জনাব মো. ফজলুল কাদের, বলেন; বাংলাদেশে আবাদি জমির পরিমাণ প্রতিবছর গড়ে ১% করে কমছে বলে ধারণা করা হয়। স্বল্পভূমি ও বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশের জন্য এটি হবে একটি অতি বিপজ্জনক সূচক। এ পরিপ্রেক্ষিতে আমি মনে করি সনাতনী গ্রামীণ বাড়ির ধারণা পাল্টে বাংলাদেশে গ্রাম্য টাউনশিপের ধারণার ওপর ভিত্তি করে আগামী দিনের গ্রামীণ বসতিগুলো গড়ে ওঠা প্রয়োজন। দেশের চার হাজার ৫০০টি ইউনিয়নে চার হাজার ৫০০টি টাউনশিপ গড়ে উঠতে পারে। এতে অবকাঠামো খরচ ব্যাপকভাবে কমে যাবে। পাশাপাশি বিভিন্ন সেবা প্রদান সহজ হবে। গৃহায়ণের জন্য আবাদি জমির পরিমাণ সংকোচনের প্রয়োজন হবে না। স্থপতি ও প্রকৌশলীদের দরিদ্রবান্ধব ও ব্যয়সাশ্রয়ী ঘরের নকশা করতে হবে, যা ঝড়-বৃষ্টির এবং বন্যাপ্রবণ দেশের জন্য উপযোগী হবে। সেই সঙ্গে পরিকল্পনাবিদদের উল্লিখিত টাউনশিপগুলোর নকশা তৈরি করতে হবে। এ ধরনের টাউনশিপ করার জন্য সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকা প্রয়োজন। বেসরকারি গৃহায়ণ প্রতিষ্ঠানগুলো এ ধরনের টাউনশিপ গঠনে এগিয়ে আসতে পারে। প্রথমে এ ধরনের কিছু কিছু টাউনশিপ হলে তা ব্যাপক চাহিদার জন্ম দেবে বলে আমার ধারণা। ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক এবং প্রস্তাবিত টাউনশিপের বাসিন্দারা এতে অর্থায়ন করতে আগ্রহী হবে। পুঁজিবাজার থেকেও অর্থ সংগ্রহ করা যেতে পারে।

পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলামতাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের গ্রামগুলো অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠছে। এলজিইডির রাস্তাগুলো অনেক অপরিকল্পিতভাবে করা হচ্ছে। ঢাকা শহর ছড়িয়ে যাচ্ছে, যার ফলে আশপাশের গ্রামগুলোতে অপরিকল্পিত আবাসস্থল তৈরি হচ্ছে। যেমন পূর্বাচল সরকারি প্রকল্প হওয়ায় এর আশপাশে যেখানে কোনো উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ নেই, সেখানে মানুষ অপরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন করছে। National Policy দরকার। Compact Township করা যেতে পারে, যেখানে সব ধরনের সুযোগ সুবিধা থাকবে। National Physical Planning Authority গঠন করা আবশ্যক।

পরিকল্পনাবিদ মো. আমিনুল কাইয়ুম, তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন; Compact Township -এর মাধ্যমেই গ্রামের আবাসন রূপান্তর করা সম্ভব। এই পুনর্বাসনের পেছনে যেসব প্রভাবক রয়েছে তা হচ্ছে; পুনর্বিন্যাসিত বসতির সঙ্গে অভিযোজন পর্যাপ্ত অবকাঠামো উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার মাধ্যমে নতুন বসতির প্রতি আকর্ষণ, ভূমি অধিকার সঠিকভাবে পুনর্গঠন, অধিবাসীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণ, গ্রাম্য বসতির বিভিন্ন দিক নিয়ে জানতে হবে এবং এসব বিষয় মাথায় রাখতে হবে পুনর্বিন্যাসের পরিকল্পনা করার সময় নতুন পুনর্বিন্যাসকে টেকসই করার জন্য প্রথমে তাদের জীবিকা নির্বাহের উপায় নিয়ে ভাবতে হবে।

পরিকল্পনাবিদ . এইস. এম. মোজাম্মেল,  বলেন, সমস্যা যাদের, তাদের মতো করে চিন্তা করতে হবে। রেমিট্যান্স দিয়ে ব্যাংক তৈরি করতে হবে। সেই ব্যাংক সুদ ছাড়া ক্রেডিট দেবে ৯০ দিনের জন্য। এনজিওগুলোর ক্ষুদ্রঋণ প্রথা কমাতে হবে। Compact Township -এর পক্ষে সুপারিশ করছি। খাদ্য, শাকসবজি সঠিক উপায়ে মজুত করতে হবে। বায়োগ্যাস, কমপোস্ট সার ইত্যাদি ব্যবহার করা যেতে পারে। কৃষকদের ভর্তুকি আরও বাড়াতে হবে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে হবে।

Leave a Reply