৩য় গোলটেবিল বৈঠক : ‘গ্রামীণ বসতির নবরূপের সম্ভাবনা’

সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে পেশাজীবীদের মতামত জনসম্মুখে উপস্থাপনের লক্ষ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে ফোরাম ফর ফিজিক্যাল ডেভেলপমেন্ট অব বাংলাদেশ (এফপিডি)। এর বিভিন্ন কার্যক্রমের একটি হচ্ছে বিষয়ভিত্তিক আলোচনার মাধ্যমে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গের মতামত সংগ্রহ করে প্রকাশনা বের করা। এই উদ্দেশ্যে গত ১৬ জুলাই ২০০৯ তারিখে Renewal Prospect of Rural Habitat (গ্রামীণ বসতির নবরূপের সম্ভাবনা) শীর্ষক তৃতীয় গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় শেল্টেক্ লাউঞ্জে, ৫৫ পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা-১২০৫। উক্ত গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন-

১) ড. তৌফিক এম. সেরাজ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, শেল্টেক্ (প্রা.) লিমিটেড; চেয়ারম্যান, এফ.পি.ডি

২) স্থপতি কাজী আনিসউদ্দিন ইকবাল, চেয়ারম্যান, বিল্ডিং ফর ফিউচার লিমিটেড; নির্বাহী পরিচালক, এফ.পি.ডি

৩) প্রকৌশলী তানভিরুল হক প্রবাল, সভাপতি, রিহ্যাব; ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বিল্ডিং ফর ফিউচার; ফিন্যান্স ডিরেক্টর, এফ.পি.ডি

৪) প্রকৌশলী মাহমুদুল হাসান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, হাসান অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেড

৫)অধ্যাপক ড. এ.কে.এম.এ. কাদের, কেমিকৌশল বিভাগ, বুয়েট

৬)স্থপতি জালাল আহমেদ, প্রিন্সিপাল আর্কিটেক্ট, জে.এ. আর্কিটেক্টস

৭) অধ্যাপক ড. এ.এম.এম. তৌফিকুল আনোয়ার, পুরকৌশল বিভাগ, বুয়েট

৮) অধ্যাপক ড. এম. নুরুল ইসলাম, ইনস্টিটিউট অব অ্যাপ্রোপ্রিয়েট টেকনোলজি, বুয়েট

৯) অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম শরিফ, অ্যাপলাইড ফিজিক্স অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস ডিপার্টমেন্ট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

১০) স্থপতি নাহাশ আহমেদ খলিল, প্রিন্সিপাল আর্কিটেক্ট, আর্ক আর্কিটেকচারাল কনসালট্যান্ট

১১) জনাব বিদ্যুৎ কুমার মহালদার, মনিটরিং অ্যান্ড ইভল্যুশন এক্সপার্ট, সি.ডি.এম.পি

১২) জনাব শোয়েব শাহরিয়ার, গবেষণা কর্মকর্তা, ওয়েস্ট কনসার্ন

. তৌফিক এম. সেরাজ,  স্বাগত বক্তব্য উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, আমাদের দেশের উন্নয়ন নিয়ে যেসব আলোচনা হয় সেগুলো বেশির ভাগই অর্থনীতিভিত্তিক। কারিগরি বিষয় নিয়ে যদিও সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী সংগঠনগুলো মূল্যবান সিদ্ধান্ত দিয়ে থাকেন। কিন্তু এগুলো অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকর করা হয় না। তা ছাড়া বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন শুধু তাদের নিজস্ব পেশায় অভিজ্ঞতার আলোকে মতামত দিতে পারেন। কিন্তু সঠিক উন্নয়ন কৌশল খুঁজে বের করতে হলে এর আনুষঙ্গিক বিভিন্ন বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তিবর্গের মতামত প্রয়োজন হয়।

আপনারা জানেন, National Housing Policy এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। আমরা এই ফোরামের মাধ্যমে Multi-Sector Policy Guideline দেওয়ার চেষ্টা করব এবং প্রকাশনা বের করে সবার সামনে তুলে ধরব। আমাদের এখনকার আলোচ্য বিষয় গ্রামীণ বসতির পুনর্বিন্যাস, যা শুধু একটি সেক্টরের বিষয় না। এর সঙ্গে পয়োনিষ্কাশন, বন্যা, ক্ষরা, পরিবেশসহ নানা বিষয় জড়িত। কাজেই এই আলোচনা সভায় সংশ্লিষ্ট বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন পেশাজীবীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। আশা করি আপনাদের মূল্যবান মতামতের ভিত্তিতেই সমস্যা সমাধানের কৌশল বেরিয়ে আসবে।

অধ্যাপক . .কে.এম.. কাদের, বলেন, আমাদের দেশের গ্রামীণ জনসাধারণের শতকরা ৪০ ভাগ ভূমিহীন। কাজেই তাদের জন্য বাড়ি তৈরির জন্য ভূমি সংস্থান কঠিন হয়ে পড়বে। বর্তমানে আমাদের দেশে আবাদযোগ্য মাথাপিছু জমি ৫২০ বর্গমিটার। আগামী ৪০ বছরে এই জমির পরিমাণ দাঁড়াবে ২৬০ বর্গমিটার। তখন আমাদের খাদ্যশস্য উৎপাদন করা কঠিন হয়ে পড়বে। গ্রামীণ এলাকায় এখন রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ ও সেচের ব্যবস্থা আছে। উন্নত প্রজাতির বীজ ব্যবহারে শস্য উৎপাদন বেড়েছে। গ্রামের মেধাবী জনসাধারণ শহরে চলে আসছে। ফলে গ্রামের সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় হচ্ছে এবং যোগ্য নেতৃত্বের অভাব হচ্ছে। গ্রামীণ জনগোষ্ঠী মুরব্বিদের অভিজ্ঞতার আলোকে বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় স্বয়ংসম্পূর্ণ। গ্রামীণ বসতি তৈরি করতে হবে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও কৌশল অনুসরণ করে। এর জন্য প্রথমে তাদের মতামত নিতে হবে। বাসস্থান বিনা মূল্যে দেওয়া যাবে না, তাহলে এ ধরনের উদ্যোগ সফল হবে না।

স্থপতি জালাল আহমেদ, বলেন, গ্রামীণ বসতির পুনর্বিন্যাস করতে হবে নদীর ভাঙন, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় এবং বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকি মোকাবিলার জন্য। অধিবাসীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং জীবনযাত্রার মান নিশ্চিত করতে পারলে গ্রামীণ বসতির নবরূপের উদ্যোগ সফল হবে। প্রয়োজনীয় নির্মাণ উপকরণসমূহ গ্রামীণ এলাকায় বিদ্যমান। যেমন; বাঁশ, বেড়া, টিন, খুঁটি ইত্যাদি।

অধ্যাপক . .এম.এম. তৌফিকুল আনোয়ার,বলেন, আমাদের জমির পরিমাণ অত্যন্ত কম। তাই এর সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। স্বল্প খরচের বাড়ি অবশ্যই মজবুত হতে হবে। অল্প সময়ে নির্মাণকাজ শেষ করতে হবে। Prefabricated  নির্মাণ উপকরণের ব্যবহার বৃদ্ধি করতে হবে। গ্রামীণ বসতির নবরূপ দেওয়ার জন্য অধিবাসীদের সামর্থ্য বাড়াতে হবে। ব্যাংক, ইনস্যুরেন্স কোম্পানি, পেনশন ফান্ড থেকে অর্থের জোগান দিতে হবে।

অধ্যাপক . এম. নুরুল ইসলাম, বলেন, বহুমুখী কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে টেকসই জীবিকা ও আয় নিশ্চিত করার জন্য। গৃহহীনদের জন্য উন্নত বাসস্থান নিশ্চিত করতে হবে। ভবিষ্যৎ কৌশল নির্ধারণের জন্য Indigenous Technological Knowledge (ITK) বাছাই করতে হবে। গ্রামীণ ব্যাংকের গৃহায়ণ কর্মসূচি সফল হয়েছে অর্থ ও প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে। দীর্ঘকাল যাবৎ সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে উদ্যোক্তা এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে মতবিরোধ হতে পারে। মূল্যবান মতামতগুলো একত্র করে প্রকাশনা তৈরির কাজটি একটি সফল উদ্যোগ।

অধ্যাপক . রফিকুল ইসলাম শরিফ,  বলেন, গ্রামে বসবাসের জন্য আগ্রহী করে তুলতে হলে তাদের আয়ের উৎস তৈরি করতে হবে। কুটিরশিল্প, উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহারে কৃষির উন্নয়ন, মৎস্য চাষ, পশুপালন, খাদ্য উৎপাদন, আধুনিক টেলিযোগাযোগব্যবস্থা, কম্পিউটার প্রযুক্তি, বিদ্যুৎ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ইত্যাদি ক্ষেত্রে উন্নয়ন সাধন করতে হবে ধাপে ধাপে। গ্রামের জনসাধারণ তাদের স্থায়ী বসতবাড়িতে থাকতে বেশি আগ্রহী হবে। শহরের জনসাধারণ গ্রামে থাকতে আগ্রহী হবে, যদি বিভিন্ন ধরনের বাসস্থান করে দেওয়া সম্ভব হয়। সৌরশক্তি, বায়োগ্যাস, উইন্ড মিল ইত্যাদির মাধ্যমে গ্রামে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব। জেনারেটরের মাধ্যমেও সম্ভব তবে প্রয়োজনের তুলনায় খরচ বিবেচনা করতে হবে। সাধারণ জনগণের জন্য জেলা ও উপজেলা শহরের অদূরে স্যাটেলাইট শহর তৈরি করতে হবে।

জনাব বিদ্যুৎ কুমার মহালদার,  বলেন, আইলার আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত জনসাধারণের জন্য এক লাখ ২০ হাজার টাকায় ২৪০ বর্গফুটের বাড়ি তৈরি করা হচ্ছে। প্রতি বর্গফুটের দাম ৫০০ টাকা। ঘূর্ণিঝড় ও বন্যাকবলিত মানুষের পুনর্বাসনের কাজ করে বুঝতে পেরেছি গ্রামীণ বসতির নবরূপ নিশ্চিত করতে হলে প্রথমে টার্গেট গ্র“প নির্ধারণ করতে হবে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো টাকা ভূমিহীনদের উন্নত বাসস্থান নির্মাণে ব্যবহার করা যেতে পারে। অনেকগুলো ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রের যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে না। গ্রামের মধ্যবিত্তরা বাড়ি ছাড়তে আগ্রহী হবে না। কাজেই তাদের নিজস্ব জায়গায় স্থায়ী বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। গ্রামের উচ্চবিত্তদের শহরতলিতে বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রাচীন জেলা শহরগুলোতে যাদের সামর্থ্য আছে তাদের শহরের ভিতর তৈরি অ্যাপার্টমেন্টের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

জনাব শোয়েব শাহরিয়ার, বলেন, পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ টেকশই বাসস্থান নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় আবহাওয়ার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ একত্র বাসস্থান নিশ্চিত করতে হবে। সৌরশক্তির মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে কৃষিকাজ, জৈব সারের ব্যবহার ইত্যাদি নিশ্চিত করতে হবে। ব্যবহৃত প্রযুক্তি অবশ্যই যথোপযুক্ত এবং সাধ্যের মধ্যে হতে হবে। জনসাধারণের আয়ের উৎস থাকতে হবে। মৌলিক চাহিদা স্বাস্থ্য, শিক্ষাসহ অন্যান্য প্রযুক্তিগত সুযোগ-সুবিধা থাকতে হবে। গ্রামীণ বসতিগুলোর একটি করে কেন্দ্রীয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থা থাকতে হবে। অন্যথায় এর আশপাশের পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হবে।

স্থপতি নাহাশ আহমেদ খলিল, বলেন, আমরা শহুরে জীবনযাপনের সঙ্গে গ্রামীণ জীবনযাপনের তুলনা করতে পারি। ঢাকা শহরে অধিবাসীদের জীবন অত্যন্ত দুর্বিষহ। অন্যদিকে গ্রামীণ পরিবারগুলোও দিন দিন একক পরিবারে পরিণত হচ্ছে। বাসস্থানের জন্য গ্রামীণ জীবন ভালো কিন্তু চাকরির জন্য আবার শহরে আসতে হয়। গ্রামীণ বসতির পুনর্বিন্যাসের সুযোগ অত্যন্ত কম। কৃষিজমির পাশে ছোট শহর না করে বর্তমান গ্রামগুলোকে উন্নত করতে হবে।

Leave a Reply